খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনার নাম থেকে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এদের মধ্যে আছেন জীববিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, প্রখ্যাত রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কবি জীবনানন্দ দাশ, এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরী। সমালোচনার মুখে এখন কেউই এ বিষয়ে দায় নিতে রাজি হচ্ছেন না।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, মনীষী ও বুদ্ধিজীবীদের নামে থাকা স্থাপনার নাম পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব তারা দেননি। ‘হল ও বিভিন্ন ভবনের নতুন নামকরণ প্রস্তাবনা কমিটি’ জানিয়েছে, তারা শুধু নামের প্রস্তাব সংগ্রহ করে জমা দিয়েছে। সিন্ডিকেট সদস্যরা বলেছেন, তারা শুধু কমিটির প্রতিবেদন অনুমোদন করেছেন। অন্যদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেছেন, বিষয়টি শুধুমাত্র তার ওপর চাপানো ঠিক নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৪ ডিসেম্বর একটি কমিটি গঠন করা হয়। ৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, যেখানে ‘পলিটিক্যালি বায়াসড’ (রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট) নাম পরিবর্তন প্রস্তাবের জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আহ্বান জানানো হয়। পরবর্তীতে ৮ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সভায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং ১২ ফেব্রুয়ারি অফিস আদেশ জারি করা হয়।
নতুন আদেশে, পূর্বের বেশ কিছু নাম পরিবর্তন করা হয়। যেমন, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসনিক ভবনের নাম পরিবর্তন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য গোলাম রহমানের নামে রাখা হয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের নাম একাডেমিক ভবন-১, জগদীশচন্দ্র বসু একাডেমিক ভবনের নাম একাডেমিক ভবন-২, কবি জীবনানন্দ দাশ একাডেমিক ভবনের নাম একাডেমিক ভবন-৩ এবং আরও অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে।
এছাড়া, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরী চিকিৎসাকেন্দ্রের নাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার, সুলতানা কামাল জিমনেসিয়ামের নাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেসিয়াম, এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের নাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গবেষণাগার করা হয়েছে। যদিও, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম বাদ দেওয়া হয়নি।
এ ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তীব্র সমালোচনা করেছেন। শিক্ষাবিদ এবং সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বিষয়টিকে ‘নিম্ন রুচির’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “এটা খুবই নিম্ন মানসিকতা ও নিম্ন রুচির পরিচয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের এমন মানসিকতা থাকতে পারে, এটা চিন্তায়ও আসে না।”
এদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী আয়মান আহাদ জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে ছিল, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নামে থাকা ভবনগুলোর নাম পরিবর্তন করা, কিন্তু অনেক অরাজনৈতিক ব্যক্তির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করেননি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রেজাউল করিম বলেন, “এটা আমার একক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ছিল।” তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীরা যদি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চান, তাহলে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মো. মুজিবর রহমান বলেছেন, সিন্ডিকেটের সদস্যরা শুধু কমিটির রিপোর্ট পাস করেছেন, নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতি আরও বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যা বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।