‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ নিয়ে গত দুই দিনে নানা নাটকীয়তার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, ‘জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র দেয়া হবে।’ এর পরেই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীরা তাদের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
সোমবার রাতে একাধিক বৈঠকের পর, গভীর রাতে শিক্ষার্থীরা ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ নামে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন ঘোষণাপত্র ছাড়া আন্দোলন চালিয়ে যেতে হলো।
বিবিসি বাংলার সাথে আলাপচারিতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, প্রধান উপদেষ্টার দফতর এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, মূলত সরকার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে সংবিধান স্থগিত করার বিষয়টি সামনে আনলে সরকারের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে যেত। পাশাপাশি, বিএনপির নেতৃবৃন্দ এই ঘোষণাপত্রকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেননি, যার ফলে ছাত্রদের ঘোষণাপত্রের কর্মসূচির বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারকে এক ধরনের বার্তা পাঠানো হয়েছিল, যাতে তারা ঘোষণাপত্রটি না দিতে চাপ দেয়। একই সময়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে সোমবার রাতে প্রধান উপদেষ্টা অফিস থেকে জানানো হয়, ‘জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’ এরপরই বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা তাদের ঘোষণাপত্রের কর্মসূচি স্থগিত করে, তবে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই উদ্যোগকে প্রাথমিক বিজয় হিসেবে দেখছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সংগঠনের মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসউদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ঘোষণাপত্রের বিষয়টি বাতিল করতে দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু সরকারকে বাধ্য করে সেটি দেয়া হবে, এটিই আমাদের প্রাথমিক বিজয়।"
অন্যদিকে, দার্শনিক ও সমাজ বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার বলেন, "গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট হয়েছিল। সেই হিসেবে ঘোষণাপত্র দেয়ার কোনো বৈধতা সরকারের নেই। এটি ছাত্রদেরই দেয়া উচিত।"
সরকার গঠনের প্রায় সাড়ে চার মাস পর, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে মাঠে ছিল। গত শনিবার, ঘোষণাপত্রের বিষয়ে তাদের নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, ‘৭২ এর সংবিধানের কবর রচনা’ করা হবে। তবে সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, "এই কর্মসূচি ছিল একটি প্রাইভেট ইনিশিয়েটিভ।"
সরকারের এই বক্তব্যের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানান। সোমবার বিকেলে, তারা সারাদেশ থেকে দেড় থেকে আড়াই লাখ মানুষের ঢাকায় জমায়েতের ঘোষণা দেন।
তবে, সোমবার সন্ধ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর পরেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের কর্মসূচি থেকে সরে আসে এবং ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ ঘোষণা করে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, "সরকার যখন ঘোষণা দিতে রাজি ছিল না, তখন আমরা একা ঘোষণা দেব বলে জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার নিজেরাই ঘোষণা দিতে রাজি হয়েছে, এটিই আমাদের প্রাথমিক বিজয়।"
এদিকে, বিএনপির নেতৃবৃন্দ ঘোষণাপত্রের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জুলাই বিপ্লবের গণতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থান অনুযায়ী, ঘোষণাপত্র সংশ্লিষ্ট সকল রাজনৈতিক দল এবং জনগণের মতামত নিয়ে তৈরি করা হবে।"
সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
ফরহাদ মজহার সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "গণঅভ্যুত্থানের পর এই সরকার সাংবিধানিকভাবে বৈধ নয়। এটি ৭২-এর সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।" তিনি আরও বলেন, "সরকার রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়াই দেশের জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা জনগণের জন্য অগ্রহণযোগ্য।"
সরকারের ঘোষণাপত্র নিয়ে, তিনি বলেন, "এটি ছাত্রদের দেওয়া উচিত ছিল, তারা যেভাবে তাদের দাবিগুলো প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, সরকার সেটা অন্তর্ভুক্ত করতে পারত।"
এ বিষয়ে সরকারের একটি সূত্র জানায়, যদি ঘোষণাপত্রে সংবিধান বাতিলের মতো কোনো সিদ্ধান্ত আসত, তা সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত। ফলে, সরকারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের ঘোষণাপত্র কর্মসূচি স্থগিত করার পর নিজেদের বিজয় দাবি করলেও, বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে জনগণের মতামত নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি